দারুল আহনাফ

দারুল আহনাফ
দারুল আহনাফ: অসত্যের বিরুদ্ধে

ডিবেটে আব্বাসী সাহেবের ভাষা ব্যবহার নিয়ে আমার পোস্ট: আপত্তির জবাব

ডিবেটে আব্বাসী সাহেবের ভাষা ব্যবহার নিয়ে আমার করা পোস্টটি যারা আমার পোস্টটি আগে পড়েননি তাদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

“নিঃসন্দেহে আব্বাসী সাহেবের ডিবেট প্রশংসনীয়; কিন্তু তিনি একজন দা'ঈ হিসেবে তার কিছু শিশুসুলভ আচরণ সংশোধন করা অতীব জরুরী। এটা আমার বলার অপেক্ষা রাখে না, বরং আপনারাও স্বীকার করবেন। এক কথায় উক্ত ডিবেটটি আমার কাছে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে হয়নি।

এছাড়া তার আরো কিছু ভুল ভ্রান্তি রয়েছে যা আমাদের অনেকের চোখে পড়ে না। আহলে কুরআনের প্রতি বিদ্বেষ থাকার কারণে আমরা আব্বাসী সাহেবের ভুল যুক্তিগুলোকেও অসাধারণ ভেবে নিয়েছি। অথচ তার কিছু যুক্তি ছিল সম্পূর্ণ কুযুক্তি। আমি এখানে সংক্ষেপে আব্বাসী সাহেবের তিনটি কুযুক্তি নিয়ে আলোচনা করবো, দয়া করে কেউ ভুল বুঝবেন না। 

আশা করি, এই আলোচনাটা আমাদের মস্তিষ্ক পরিষ্কার করার জন্য খুবই উপকারী হবে। কারণ, যে যেভাবে বলে, আমাদের পক্ষে হওয়ার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা সেটাকেই সঠিক ধরে নিই, নিজের মস্তিষ্ক দ্বারা কিছু ভাবতে পারি না। তাই আমাদেরকে সবসময় পরের চিন্তা ধারার ওপর ভরসা করতে হয়।

১. তিনি বলেছেন, এই যে আবু সাঈদ ভাই, তাকে আমি আদর করি। কারণ, সে অবুঝ! আমার মক্তবের একটা ছেলের যে জ্ঞান আছে আমার আবু সাঈদ ভাইয়ের তা নেই! আমার আফসোস, তার ৩০ বছরের গবেষণা ৩০ মিনিটে শেষ। —(এক ভাই এটি পোস্ট করে লিখেছেন, এতো সুন্দর করেও বাঁশ দেওয়া যায়!)

কিন্তু আমি বলবো, এখানে সূক্ষ্ম বাঁশ দেওয়ার কী হলো! আদতে উক্ত বক্তব্যের মধ্যে জ্ঞানগর্ভ কিছুই নেই। নায্যভাবে বলতে গেলে, এটি সম্পূর্ণ আত্ম-অহংকার-মূলক, অযৌক্তিক ও অর্থহীন একটি কথা। 

কারণ, স্বাভাবিকভাবেই মক্তবের একটা ছেলের জ্ঞান আবু সাঈদ ভাইয়ের চেয়ে বেশি হবে তো দূরের কথা, আবু সাঈদ ভাইয়ের জ্ঞানের ধারে কাছেও হবে না। নিঃসন্দেহে আবু সাঈদ ভাইয়ের জ্ঞান মক্তবের ছাত্রদের চেয়েও বেশি; আমরা না মানলেও বেশি। কারণ, একটা মক্তবের ছেলে হাদীস কী, হাদীস মানতে হবে কি হবে না- এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। এখন আবু সাঈদ কেবল হাদিস অস্বিকারকারী হওয়ার কারণে তাকে অবুঝ বলা, মক্তবের ছাত্রদের চেয়ে অধম বলা কখনোই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। 

হতে পারে আব্বাসী সাহেব মক্তবের ছেলের চেয়ে অবুঝ বলেছেন, কারণ মক্তবের ছেলে হাদীস অস্বীকার করে না, আবু সাঈদ করে। কিন্তু আমি বলব, মক্তবের ছেলে হাদিস অস্বীকার না করার পিছনে তার অজ্ঞতাই প্রধান কারণ। কেননা, হাদিস স্বীকার করতে হয় নাকি অস্বীকার করতে হয়, সে তো সেটাই জানে না। 

ধরুন, একজন হিন্দু পণ্ডিত। আপনি যদি তাকে কেবল অমুসলিম হওয়ার কারণে একটা মক্তবের ছাত্রর চেয়ে অবুঝ বলেন, বলতেই পারেন। আপনার যুক্তি হচ্ছে, মক্তবের ছাত্র ইসলাম ইসলাম বোঝে, তাই মুসলিম। আর হিন্দু পণ্ডিত ইসলাম বোঝে না, তাই সে মুসলিম নয়। কিন্তু আপনার এই যুক্তি নিঃসন্দেহে ভুল। কারণ, মক্তবের ছাত্র মুসলিম তার মা-বাবা এবং পরিবেশের কারণে, ইসলাম সম্পর্কে হিন্দুর চেয়ে তার জ্ঞান বেশি হওয়ার কারণে নয়। তাইতো একজন হিন্দু পণ্ডিত তাকে অতি সহজেই কাবু করে ফেলতে পারবে। কিন্তু আপনি যদি হিন্দু পণ্ডিতকে কেবল অমুসলিম হওয়ার অপরাধে চাপার জোরে মক্তবের ছাত্রের চেয়ে অবুঝ বলেন, বলতেই পারেন; কিন্তু তা অর্থহীন।

একইভাবে আবু সাঈদ সাহেবের ক্ষেত্রেও অর্থহীন কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আবু সাঈদ সাহেব হাদীস অস্বীকারকারী হওয়ার কারণে তাকে মক্তবের ছাত্রের চেয়ে অবুঝ বলা হয়েছে‌। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে একটা মক্তবের ছাত্র হাদীস অস্বীকার করে না এ ব্যাপারে তার জ্ঞান বেশি থাকার কারণে নয় বরং তার পরিবেশের কারণে, অথবা হাদীসের বিষয়টি সে জানেও না যে, হাদীস স্বীকার করতে হয় নাকি হয় না! কাজেই আবু সায়েদ সাহেবকে মক্তবের ছাত্রের চেয়ে অবুঝ বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

দ্বিতীয়তঃ এমন কথার কোনো অর্থ নেই, যে কথা আপনার প্রতিপক্ষও আপনাকে ফিরিয়ে দিতে পারে। যেমন, কেউ কাউকে বললো, ‘তুই তো আমার জুতা বহন করার যোগ্যতাও রাখিস না’। তো জবাবে সেও তাকে বললো ‘তুইও তো আমার জুতা বহন করার যোগ্যতা ও রাখিস না।’ এক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তির কথাটি অর্থহীন। কারণ, এটি এমন একটি কথা, যে কথা সবাই ব্যবহার করতে পারে; এর জন্য বিশেষ কোনো যোগ্যতা থাকা শর্ত নয়।

তো আব্বাসী সাহেবের কথাটিও আবু সাঈদ সাহেব তাকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন। যেমন, এই যে আব্বাসী সাহেব, তাকে আমি আদর করি। কারণ, সে অবুঝ! আমার স্কুলের প্লে শ্রেণীর একটা ছেলের যে জ্ঞান আছে আমার আব্বাসী ভাইয়ের তা-ও নেই! 

যাইহোক, আত্ম-অহংকারী ব্যক্তিরাই এভাবে অন্যকে অবুঝ অবুঝ বলে সম্বোধন করে‌। অথচ অবুঝ বলাটা সবার জন উন্মুক্ত। মূলত, কাউকে অবুঝ বলাটা বাহাদুরি নয়, বরং অবুঝ প্রমাণ করাটাই বাহাদুরি। আর যদি অবুঝ প্রমাণ করেই দিতে পারেন, তাহলে আর মুখে অবুঝ বলার প্রয়োজন রাখে না।  

২. আব্বাসী সাহেব আবু সাঈদ সাহেবকে পানি খাওয়ার আদব জিজ্ঞাসা করেছেন। পানি কিভাবে খাবে, কুরআন থেকে দলিল দিন। এই প্রশ্নটিও অযৌক্তিক। কারণ, আবু সাঈদ সাহেব এভাবে উত্তর দিতে পারতেন যে কুরআনে পানি খাওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো আদব বলা হয়নি, সুতরাং যেকোনোভাবে পানি খাওয়া যাবে। 

তাছাড়া একজন পিপাসার্ত ব্যক্তির পানি পান করার মুহূর্তে এমন প্রশ্ন করা সত্যিই অমানবিক। আর ইসলাম কোনো কাফেরের সাথেও এমন অমানবিক আচরণ করতে উৎসাহিত করে না।

৩. সবচেয়ে হাস্যকর বিষয়টি হচ্ছে, আপনি এবং তুমি সম্বোধন নিয়ে আব্বাসী সাহেবের কুযুক্তি। এ নিয়ে বিস্তৃত লিখতে গেলে পোস্ট বড় হয়ে যাবে, তাই অতি সংক্ষিপ্তভাবে একটি কথা বলি। যেহেতু কুরআনে ‘আপনি’ সম্বোধন করার দলিল নেই, তাহলে আব্বাসী সাহেব কি হাদীস থেকে ‘আপনি’ সম্বোধন করার দলিল দিতে পারবেন? 

মূলত, প্রত্যেক ভাষাই আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি। কুরআনের আদেশ হচ্ছে, মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ ও উত্তম ভাষা ব্যবহার করো। আর আমরা জানি বাংলা ভাষা হিসেবে ‘আপনি’ হচ্ছে উত্তম সম্বোধন আর ‘তুমি’ হচ্ছে সাধারণ/তুচ্ছ সম্বোধন। অতএব উত্তম আচরণের অংশ হিসেবে ‘আপনি’ সম্বোধন করাই কুরআনের দাবী।”

এই পোস্টটি আমি কেনো করলাম?

আব্বাসী সাহেবকে নিয়ে আমার করা পোস্টটি সম্পর্কে কিছু কথা

আমার উক্ত পোস্টে যারা কমেন্ট করেছেন, তাদের অধিকাংশের কথা ছিলো, আমি কেন আবু সাঈদ সাহেবের ভুল নিয়ে আলোচনা না করে আব্বাসী সাহেবের ভুল নিয়ে আলোচনা করলাম।

১. আমি সবসময় সত্যটা খোঁজার চেষ্টা করি। কোথায় মানুষ সূক্ষ্ম ভুল করে সেটা বের করার চেষ্টা করি। ভুল কে করলো- সেটা দেখি না; বরং ভুল কী করলো সেটাই দেখি। 

আবু সায়ীদ সাহেবের মতবাদ ভুল- সেটা তো সুস্পষ্ট, এটি প্রমাণের জন্য তো আব্বাসী সাহেবের ডিবেটই যথেষ্ট। তাই এ নিয়ে কোনো কথা বলিনি। কিন্তু আব্বাসী সাহেবের ভুল কোথায় এটা অনেকের কাছে অস্পষ্ট। এমনকি অনেকে আব্বাসী সাহেবের দেখাদেখি তার এই রুক্ষ আচরণ ও অপযুক্তিগুলোকেই ডিবেটের মূল হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করছে এবং এজন্য তাকে বাহবা দিচ্ছে। অথচ এটি ডিবেটের সঠিক পদ্ধতি ছিলো না। এতে করে উলামা সমাজ আরো হাসির পাত্র হবে ও তিরস্কৃত হবে। জেনারেলদের মাঝে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে। এ কারণে আমি আব্বাসী সাহেবের কুযুক্তি বিষয়ে আলোকপাত করেছি; যাতে করে নতুন প্রজন্ম এর থেকে বিরত থাকতে পারে এবং এসবের যুক্তিহীনতা বুঝতে পারে।

তাছাড়া আমি আবু সায়ীদ সাহেবের কোনো কাজকে প্রমোট করিনি। বরং তাকে পরাস্ত করতে গিয়ে আব্বাসী সাহেব যে ভুল স্টেপ গুলো নিয়েছেন সেগুলোর সমালোচনা করছি। সবাইতো আব্বাসী সাহেবের প্রশংসাই করেছে এবং করছে, তাহলে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে কে?



সর্বোপরি, আমি চাই ঐ জিনিস নিয়ে আলোচনা করতে যে জিনিস নিয়ে সাধারণত মানুষজন আলোচনা করে না, এবং ওই ভুলটা ধরতে যে ভুলটা সাধারণত কেউ ধরে না/ধরবে না।

আপত্তি উঠতে পারে, এক্ষেত্রে সময়কাল বিবেচনা করা উচিত ছিল। এই মুহূর্তে আলোচনাটা করা উচিত হয়নি; কারণ, হতে পারে এ আলোচনাটি হাদিস অস্বীকারকারীদের রসদ জোগাতে পারে।

এর জবাবে আমি বলবো, এটাকে ঘরোয়া আলোচনা ধরতে পারেন। কারণ, আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আহলে কুরআন বলতে নেই। কেবল একজন হয়তো আছেন। কাজেই তাদের রসদ জোগানোর বিষয়টি অবাস্তব। আর যদি রসদ জোগানোই হয়, তাহলে এখন আলোচনা করলেও হবে পরে আলোচনা করলেও হবে।

তাই আলোচনাটা আমি মুত্তাসিল সেরে নিয়েছি; কারণ, আলোচনাটা এই মুহূর্তে না করলে পরবর্তীতে ততটা প্রভাবক হবে না। তাছাড়া ট্রেন্ডিং বিষয়ে ট্রেন্ড থাকতে থাকতেই কথা বলতে হয়। তাহলে মানুষ গভীরভাবে ভাবতে পারে, ভাবার সুযোগ হয়।

এর বাইরে আমার উক্ত পোস্টের মন্তব্যের ঘরে অনেকেই আমার বিপরীতে মত প্রকাশ করেছেন। এবং আমার মতকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। চাইলে আমি আলাদা আলাদাভাবে প্রত্যেকটি মন্তব্যের উপযুক্ত জবাব দিতে পারি, কিন্তু অনর্থক মনে করি।

অবশেষে আমার সকল ফ্রেন্ডদের উদ্দেশ্যে বলছি- ওয়াল্লাহি, বিল্লাহি, তাল্লাহি! গতকালকের পোস্টটি আমি আব্বাসী সাহেবকে হেয় করার জন্য নয়, নিজেকে জ্ঞানী জাহির করার জন্য নয়, আবু সাঈদ সাহেবের পক্ষ নিয়ে নয়; বরং ওলামাদের পক্ষ নিয়েই করেছি। যাতে করে ওলামাগণ এমনসব বিষয় থেকে বিরত থাকেন যা তাঁদের হাসির পাত্র হওয়ার কারণ হবে এবং জনসমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করবে।

বিনীত: লুবাব হাসান সাফ‌ওয়ান

কোন মন্তব্য নেই

mattjeacock থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.