কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা সাধারণত যে ৬টি কারণে লা-মাযহাবী মতবাদ গ্রহণ করে
১. অল্প বুঝ ও নাকেসে ইলম
কওমী মাদ্রাসাতে পড়ুয়া এমন কিছু ছাত্র আছে, যাদের বুঝশক্তি হয় অতি অল্প। ইলম হয় একেবারেই সীমিত। চিন্তার জগৎ অতি ক্ষুদ্র। এরা লা-মাযহাবদের ভুল ও জালিয়াতিপূর্ণ লেখালেখি দেখে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কারণ, এরা লা-মাযহাবদের ভুল ও জালিয়াতিগুলো ধরতে পারে না। এরা মনে করে, তারা তো মিথ্যা বলছে না, যা বলছে কুরআন-হাদীস থেকেই বলছে। প্রথম প্রথম এরা লা-মাযহাবদের অল্পস্বল্প বিরোধিতা করলেও মোক্ষম জবাব না দিতে পেরে একটা সময় সয়ে যায়। ধীরে ধীরে তাদেরকে হকপন্থী ধারণা করতেও শুরু করে। ফলে তারা লা-মাযহাবদের কিছু কিছু জিনিস গ্রহণ করে নেয়। কখনো কখনো গ্রহণ না করলেও সঠিক বলে মনে করে। এবং নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে তাদের পক্ষ হয়ে আলোচনাও তোলে। অতঃপর নিজ ঘরানার আলিমগণ যখন তাদেরকে এ সকল বিষয়ে তিরস্কার করে, তখন তারা স্বভাবতই লা-মাযহাবদের পক্ষ নিয়ে জবাব দিতে থাকে বা দেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর তাদের পক্ষ হয়ে তর্ক করতে করতে ধীরে ধীরে নিজেদেরকেও লা-মাযহাবী মনে করতে শুরু করে। একটা সময় হানাফীদের পক্ষ থেকে অধিক আঘাত পেয়ে রাগবশত পুরোপুরিভাবে লা-মাযহাবী হয়ে যায়।
২. লৌকিকতা ও অহংকারবশত
এরা নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা বোঝানোর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমহূর উলামায়ে কেরামের বিপরীতে গিয়ে কিছু শায মতামত গ্রহণ করে এবং এর পক্ষে বিভিন্ন দলিলাদি উপস্থাপন করে থাকে; যেন মানুষ তাদেরকে অন্যদের বেশি ইলমদার মনে করে। এসবের ক্ষেত্রে তারা লা-মাযহাবদেরও সাহায্য নিয়ে থাকে। অর্থাৎ লা-মাযহাবরা যে সমস্ত দলিল উপস্থাপন করে এরাও ওই দলীলগুলো উপস্থাপন করে। অতঃপর স্বজাতির পক্ষ থেকে “তুই তো লা-মাযহাবী হয়ে গেছোস” বলে গালি খায় বা তিরষ্কৃত হয়। অতঃপর স্বজাতির ওপর জিদবশত প্রথমোক্ত দলের মতো পুরোপুরি লা-মাযহাবী হয়ে পড়ে! পরবর্তীতে এরা লা-মাযহাবীদের শায়েখ হওয়ারও সুযোগ পেয়ে যায়।
৩. ওভারস্মার্টনেস ও মুরুব্বিহীনতা
এদের কথা কী আর বলবো! এরা হচ্ছে নাস্তিকের মত। নাস্তিকরা যেভাবে ওভার স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে ইসলাম ত্যাগ করে; একইভাবে এরাও ওভারস্মার্ট সাজতে গিয়ে মাযহাব ত্যাগ করে। নাস্তিকরা মনে করে ইসলাম বিষয়টা সেকেলে আর এরা মনে করে মাযহাব বিষয়টা সেকেলে। দ্বিতীয় দলের মতো এদের ভিতরেও কিছুটা অহংকার কাজ করে। এরা ভাবে, এত পড়ালেখা করে আমি কম বুঝি নাকি? সাধারণত এদের কোন মুরুব্বী থাকে না। এরা নিজেদেরকেই মুরুব্বী মনে করে। এরা আবার নিজেদেরকে মুখলিসও দাবী করে।
৪. নফস বা প্রবৃত্তিপূজা
এরা মাযহাব ত্যাগ করে নিজের প্রবৃত্তি মেটাতে। কারণ, মাযহাবের গণ্ডির মধ্যে থাকলে এরা নিজেদের মনমতো কিছু করতে পারে না। যেমন হানাফী মাযহাবে এমন অনেক বিষয় হারাম যা লা-মাযহাবীদের কাছে হালাল। কিন্তু তারা ওই হারাম কাজটি করতে চায় অথচ হারাম হওয়ার কারণে সরাসরি করতে পারে না। এরপর দেখে যে, এই একই কাজটি লা-মাযহাবীর নিকট হালাল। কিন্তু হানাফী হওয়ার কারণে তারা এটি করতে পারছে না। এমন বহু হারাম ও মাকরূহাত বিষয় আছে যা এরা হালাল করতে চায়। এ কারণে এরা মাযহাবের গণ্ডি ভিতর থাকতে চায় না। অতঃপর কুরআন ও সহীহ হাদিস মানার দোহাই দিয়ে এরাও লা-মাযহাবী হয়ে যায়; যেন নিজেদের সুবিধামতো ইমামগণের বক্তব্য গ্রহণ করতে পারে।
৫. কথিত উদারমনা ও মুক্তমনা ‘ভাব’ দেখাতে
এরা নিজেদেরকে ইসলামী মুক্তমনা মনে করে। এদের ধারণা, মাযহাব মানলেও সমস্যা নেই না মানলেও সমস্যা নেই। আকীদাহ ঠিক থাকলেই এবং কুরআন ও সহীহ হাদীস মানলেই হলো। এরা পৃথিবীর সকল বাতিল ফিরকার সমালোচনা করলেও লা-মাযহাবদের সমালোচনা করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লা-মাযাবদের সমালোচনা করার মত এদের যোগ্যতাও থাকে না।
মৌলিকভাবে এরা নিজেদেরকে লা-মাযহাব দাবী করে না বরং নিজেদেরকে সাধারণত মাযহাবীই দাবি করে। কিন্তু এদের সকল কাজকর্ম লা-মাযহাবদেরই মতো। এরা প্রয়োজন অনুসারে মাযহাবী হয়, আবার প্রয়োজন অনুসারে লা-মাযহাবী মতবাদও গ্রহণ করে। তবে এদের অধিকাংশ কথাবার্তা লা-মাযহাবীদের পক্ষেই থাকে। এরা মুখে উদারতা দেখালেও ভিতরে ভিতরে লা-মাযহাবদের হয়ে কাজ করে।
৬. ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ নীতি
অতি জযবাতি ও আকাবির-বিদ্বেষী কিছু বেয়াদব ও উগ্ৰ টাইপের তরুণ আছে; এরা হর-হামেশা আকাবিরগণের সমালোচনা করে থাকে। এ কারণে এরা স্বজাতির কাছে ব্যাপকহারে তিরষ্কৃত হয়। এরা সবসময় জ/ঙ্গি মানসিকতা নিয়ে থাকে এবং নিজেদেরকে অনেক বড় ঈমানদার মনে করে অথচ এদের ঈমান একেবারেই দুর্বল এবং তা সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমাবদ্ধ। এদের হৃদয় অতি নোংরা। হিংসা ও অহংকারে ভরপুর। স্বজাতির সাথে এদের শত্রুতা চরম পর্যায়ের। অতঃপর “শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি”র অনুসরণে স্বজাতির শত্রু লা-মাযহাবীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। বর্তমানে কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের লা-মাযহাবী হওয়ার পিছনে এই কারণটিই সবচেয়ে বেশি।
গতকাল এ বিষয়ে আমি একটি পোস্ট করেছিলাম এবং এক ভাইয়ের মন্তব্যের জবাবে আমিও একটি মন্তব্য করেছিলাম। যথাক্রমে হুবহু তুলে ধরা হলো-
পোস্ট: “কওমী মাদ্রাসার উগ্ৰ ও বেয়াদব টাইপের পোলাপানগুলা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব করে লা-মাযহাবদের প্রতি ধাবিত হয়ে যায়।
এরা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে আকাবির-বিদ্বেষী হয়ে থাকে। আকাবিরদের নাম এরা শুনতেই পারে না। ফলে তারা নিজেদের ঘরের লোকদের কাছে অবহেলিত ও অপমানিত হয়ে এবং নিজের পক্ষে কাউকে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে লা-মাযহাবীদের প্রতি ধাবিত হয়ে যায়। আগে বলতো আকাবির না মানলে সমস্যা কোথায়? এখন বলে, মাযহাব না মানলে সমস্যা কোথায়?”
কমেন্ট: (এক ভাই উক্ত পোস্টের মন্তব্যের ঘরে এর উদাহরণ চেয়েছেন; উদাহরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলাম)
ক. কওমী মাদ্রাসার এমন বহু ফারেগ দেখি থাকি, যারা সারাক্ষণ আকাবির ও নিজের উস্তায এবং অন্যান্য বড় বড় আলিমগণের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। তাদের চোখে আর কোনো ভ্রান্ত ফেরকার ভুলত্রুটি চোখে পড়ে না। অন্যরা যতই ইসলাম বিদ্বেষী বক্তব্য দিক, তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। কেবল নিজের উস্তায ও মুরুব্বিদের পিছনেই তার সময় ব্যয়িত হয়। এতে করে বাকি মুআদ্দব ছাত্রগণ তাদের এসবের বিরোধিতা করে তাদের শত্রুতে পরিণত হয়। অতঃপর ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’র অনুসরণে তারা শত্রুর শত্রু (লা-মাযহাবী)-কে বন্ধু রূপেই গ্রহণ করে।
খ. বিশেষ কোনো ব্যক্তির সাথে শত্রুতার কারণেও কেউ কেউ এমনটা করে থাকে। ধরুন, আমি সবসময় লা-মাযহাবী ফিতনা সম্পর্কে লিখি। এখন আমার সাথে আমারই আরেক ক্লাসমেট বা বন্ধুর কোনো বিষয়ে দ্বন্দ্ব হয়েছে। এরপর থেকে আমি তার শত্রু হয়ে গেলাম। স্বাভাবিকভাবেই এখন থেকে সে আমার সকল কাজকর্মের বিরোধিতা করবে।
এখন আমি যেহেতু লা-মাযহাবী ফিতনা সম্পর্কে লিখি, সে অটোমেটিকভাবে আমার এসব লেখালেখির বিরোধিতা করবে। কারণ, যেভাবেই হোক আমার বিরোধিতা তো তাকে করতেই হবে। ফলে ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’র অনুসরণে সে শত্রুর শত্রু লা-মাযহাবীকে বন্ধু রূপেই গ্রহণ করে। পুরোপুরি গ্রহণ না করলেও ওদের প্রতি একটা সফট কর্নার তৈরি হয়।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য একটা উদাহরণ দিই-
আমি লুবাব হাসান। ফেসবুক খুলেছিই কেবল লা-মাযহাবদের জালিয়াতি ও ফিতনা সম্পর্কে লেখালেখি ও সতর্ক করার জন্য। আমার কাজই হচ্ছে সারাদিন তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা। আমার টাইমলাইনে হর-হামেশা লা-মাযহাব লা-মাযহাব জিকির থাকে। আমি লা-মাযহাব ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে সাধারণত লিখি না। বলা যায় এটিই আমার পেশা।
এখন মনে করুন, আমার লিস্টে কোনো এক উগ্রপন্থী শায়েখের কিছু অন্ধ ভক্ত আছে। ঘটনাক্রমে আমি ওই উগ্রপন্থী শায়েখের বিরুদ্ধে একটা পোস্ট করলাম। এখন ওই উগ্রপন্থী শায়খের অন্ধ ভক্তরা তো অবশ্যই আমার উপর ক্ষেপে যাবে। তারা দেখবে, আমি সারাক্ষণ কী করি! আমার কাজ কী! যখন তারা দেখবে, আমার কাজ হচ্ছে লা-মাযহাবদের বিরোধিতা করা, তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করা। তখন তারা অটোমেটিকভাবেই লা-মাযহাবদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করাটাকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করবে! এবং বিষয়টিকে হেয়জ্ঞান করবে। মনের অজান্তেই লুবাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে লা-মাযহাবদের প্রতি দয়া দেখাবে! অবচেতন মনে বলে উঠবে, লা-মাহাযবরা তো এত মারাত্মক কিছু না, এত বেশি তাদের বিরোধিতা করতে হবে কেন?
যাই হোক, লুবাব তাদের চরম শত্রু হয়ে গেলো। আর লুবাবের বিরোধিতা করতে করতেই লা-মাযহাবদের প্রতি তাদের একটা সফট কর্নার তৈরি হয়ে গেলো। মূলত ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু নীতি’টি ব্যাপক; উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।
উল্লেখ্য: উপরিউক্ত কারণগুলো কেবল কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে এখানে কিছু বিষয় আছে এক্সট্রা- যা কেবল কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যই খাস।
লুবাব হাসান সাফওয়ান • www.ahnaaf.com • Maktabatul Ahnaaf
কোন মন্তব্য নেই